সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০২৪

অভিশপ্ত নীরবতায় প্রকৃতির গান


প্রতিদিন কত সহজে মৃত্যুগুলো কেবলই সংখ্যা হয়ে যাচ্ছে। না ফেরার দেশে চলে যাওয়া প্রতিটি মানুষের জীবনের সাথে জড়িয়ে ছিল আরো কত জীবন, কত গল্প। প্রতিদিনই মৃত্যু হচ্ছে কত না জানা গল্পের।

অথচ এখন টেলিভিশন পর্দার ট্রলে মৃত্যুগূলো কেবলি সংখ্যা। করোনা কেড়ে নিল জ্ঞানের বাতিঘর, শিক্ষাবিদ জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান স্যারকে। স্যারের শেষ বিদায় এমন নি:সঙ্গতায় কাম্য ছিলনা কোনভাবেই। কেমন শুন্য লাগছে। কয়েকদিন আগে এই দু:সময়ের মাঝেই আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন প্রকৌশলী, গবেষক শিক্ষাবিদ অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী।

হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছেন অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন। করোনায় হারিয়েছি আরো কত ডাক্তার, সাংবাদিক, ব্যাংকার! কেমন যেন অভিভাবকশুন্য লাগছে। অদ্ভুত এক নীরবতা ঘিরে ধরেছে আমাদের।জানিনা, কত প্রানের বিনিময়ে করোনামুক্ত হব আমরা। মহামারীর সাথে যুদ্ধ শেষে শুরু হবে মহামন্দার সাথে যুদ্ধ।

এ যুদ্ধও একদিন শেষ হবে। হয়তো নতুন এক পৃথিবীও দেখতে পাব। নতুন পৃথিবী শুরু হবে লাখো লাখো প্রানর স্থব্দতায়।এরই মাঝে কিছু মানুষ মেতে আছে বানর হত্যায়, ডলফিন হত্যার পৈশাচিক আনন্দে।

তবু স্বার্থপরের মত ভালো থাকতে চাওয়া প্রতিদিন। ঘরের চার দেয়ালে বন্দী করে রাখা। প্রতিদিন ভোরে ঘুম থেকে উঠি। ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়াই।চারিদিকে তাকাই। এভাবে আগে দেখিনি কোনদিন। প্রকৃতির বুকে নিজেকে সমর্পিত করে মন থেকে সরাতে চাই করোনার ভয়।

ব্যালকনীর ছোট বাগানে নীল অপরাজিতায় একটি ফড়িং বসতে গিয়েও বসেনা। অপেক্ষায় থাকি কখন বসে। বসলে, ধরার চেষ্টা করতাম।সেই ছোটবেলার দুপুর রোদে ফড়িঙের পেছনে দৌড়ানোর মত। অপরাজিতা গাছে ফুটেছে নীল ফুল।ফড়িংরা উড়াউড়ি করে তার চারিদিকে। বেলী ফুলের কলি দেখা যাচ্ছে,ফুটেছে নয়নতারা,অলকানন্দা। হয়তো কাল ফুটবে বেলী। পাশেই খালি জায়গা।

সেখানে অন্যান্য গাছের সাথে একটি বরই গাছ। বরই গাছের পাতার আড়ালে লুকিয়ে থেকে গান গায় টুনটুনি। নাম না জানা একটি গাছের ডালে এসে বসে এক জোড়া ঘুঘু। মন চলে যায় কৈশোরের দিন গুলোতে, কচি সবুজ ধানখেতের পাশের বরই গাছের ডালে। যেখানে এক কিশোরের নীরব চাহনিতে অপেক্ষার হাহাকার। তালগাছের বাবুই পাখিদের বাসা দুলে যায় বোশেখ বাতাসে। সাইকেলের ক্রিং ক্রিং বেল বাজিয়ে আসে ডাকপিয়ন। “চিঠি আছে?”।”না নেই”। চিঠি আসেনা।হয়তো আসবে,কাল।

হলুদ খামের মাঝে লাল জমিনের উপর সবুজ কালির সুখের বারতা। আবার একটা চিঠির অপেক্ষা। যে চিঠিতে থাকবে নতুন পৃথিবীর গল্প। জীবানুমুক্ত,মরনাস্ত্রমুক্ত, যুদ্ধমুক্ত এক সবুজ পৃথিবীর বারতা। যে পৃথিবীতে সকল যুদ্ধের হবে অবসান। সকল আগ্রাসন থেমে গিয়ে গেয়ে উঠবে সাম্যবাদের গান।

পাশের ডোবায় ডাহুকের ডাক বড় করুন লাগে। তবে কি হারিয়ে গেছে ডাহুক ছানা! ছেঁড়া ঘুড়ি আটকে আছে বড়ই গাছের ডালে। বাতাস আরও তীব্র হয়। রঙিন ” ফরফরি” হাতে পাশের বস্তি থেকে পালায় আরেক কিশোর। চোখে মেলায় কেনা রঙিন চশমা। পাশে কোথাও ঘুঘুর করুন আর্তনাদ শোনা যায়। হলুদ ফড়িঙের উড়াউড়ি চারিদিকে।

ছোট মেয়েটি ঘুম চোখ কচলে কচলে এসে জড়িয়ে ধরে তার বাবাকে।এত অফুরন্ত সময় সে পায়নি তার বাবাকে, মাকে। ব্যস্ততার সকাল এখন নীরবতার বুকে আশ্রয় নিয়েছে। মেয়েটি অবাক চোখে দেখে চারিদিক। বারান্দায় হঠাৎ উড়ে আসা চড়ুই পাখি,নীল আকাশের চিল কিংবা পাশের ডোবা থেকে উড়াল দেয়া বুলবুলি পাখির দিকে।

কান পেতে শুনা যায় বাতাসের শব্দ। নারকেল গাছের পাতায় খেলা করে ভোরের নরম আলো।শোনা যায় প্রকৃতির গান। অনেক কথা বলা হয়না, তবু অনেক কথা হয়ে যায়।এ করোনাকালীন নীরবতা। শেষ বিকেলে ছাদে গিয়ে বসি। পাখিরা নীড়ে ফেরে। পেছনে ফেলে যায় সন্ধ্যাপুর্ব রবির আলোর শেষ রক্তিম আভার মেঘদল।

এমন সন্ধ্যা আগে তো দেখিনি। করোনা নিচ্ছে অনেক কিন্তু ফিরিয়ে দিয়েছে কল্পনার স্বাধীনতা।ইচ্ছে হলেই চলে যাওয়া যায় মেঘের বাড়ীর পথে। তখন চারিদিকে ঘিরে ধরে মেঘেরা। পথ হারিয়ে যায় মেঘের ছায়ায়।

করোনা অক্টোপাসের মত যখন ঘিরে ধরে মনের বাড়ি তখন মন মুক্তি খুঁজে ভালোবাসার মেঘের বাড়ীতে।চোখ বন্ধ করে খুঁজে ফেরা যায় হারিয়ে যাওয়া গ্রামের সেই পথ।করোনামুক্ত পৃথিবীতে ফিরে আসুক সেই মেঠো পথ। যে মেঠোপথ ধরে সন্ধ্যায় হেলে দুলে বাড়ি ফিরবে রাখালের গরু। আবার ফিরে আসুক ফড়িং ধড়ার দিন।

ঝকঝকে নীল আকাশে পাখীদের নীড়ে ফেরার দিন।এখন অপেক্ষা এক মানবতার পৃথিবীর, যেখানে থাকবেনা পরমানবিক বিস্ফোরনের শক্তি প্রদর্শন, বন্ধ হবে যুদ্ধ। করোনা চলে যাক, নিয়ে যাক নাগরিক অস্থিরতা। কেবলি ছোটে চলা মানুষ একটু থামতে শিখুক। মানুষ ফিরে পাক শেকড়ের টান।অভিশপ্ত নীরবতা কেটে গিয়ে আসুক শব্দদুষন মুক্ত শান্তির নীরবতা।

 

শ্যামল কান্তি ধর

skdharnndhar@gmail.com


অন্যান্য খবর