সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০২৪

চা-শ্রমিকদের অসুখ-বিসুখ


আমাদের দেশে চট্টগ্রাম, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার এবং পঞ্চগড়ে চা-শ্রমিকেরা বসবাস করে। নামে কলোনি হলেও এরা বাস করে, বাস, খড় আর মাটির তৈরি জীর্ণ ঘরে। বাইরে হতে হঠাৎ করে কেউ গেলে মনে হবে, ঘরগুলো অপরিসর, অন্ধকারাচ্ছন্ন, এবং স্যাঁতসেতে। বেশির ভাগ ঘরেই আলো-বাতাস ঢোকার মতো যথেষ্ট জানালা নেই। ব্যবহারের জল এরা সংগ্রহ করে টিলার পাশ দিয়ে প্রবাহমান জলধারা হতে, যা স্থানীয়ভাবে ‘ছড়া’ নামে পরিচিত। এই পানিতেই রান্না-খাওয়া-গোছল-কাপড় ধোয়া সবকিছু চলে।

স্বাস্থ্যসম্মত আবাসন, বিশুদ্ধ পানীয় জল এবং পয়ঃপ্রণালীর সুব্যবস্থা না থাকায় এখানকার পরিবেশটি অপরিচ্ছন্ন এবং রোগ-ব্যাধি সংক্রমনের অনুকূল। হাঁড়িয়া-মদ ও নেশাজাতীয় দ্রব্যের সহজলভ্যতা এদেরকে আরও স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলেছে।

এটা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত যে নিয়মিত চা পান করলে মাথাব্যথা, বাতের ব্যথা, আমাশয় প্রভৃতি রোগ সেরে যায়। নিয়মিত চা পানে হৃদরোগ, ক্যান্সার এবং কিডনিরোগের ঝুঁকি কমলেও চা শ্রমিকেরা নানান রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। কলোনীর আশেপাশে তাকালেই দেখা যাবে ভগ্নস্বাস্থ্যের শিশুরা ছোটাছুটি করছে। যদি ডাক্তারী পরীক্ষা করা যেত, তাহলে নিশ্চিত করে বলা যেত, চা-শ্রমিকদের প্রতিটা শিশু অপুষ্টির শিকার।

বাবা-মায়ের অসচেতনতা এবং সুষম খাবারের অভাবেই এমনটি হয়েছে তা সাধারণভাবেই বোঝা যায়। স্থানীয় চা-শ্রমিকদের সাথে আলাপ করে জানা গেছে, শিশুরা সাধারণত জ্বর, ওজনস্বল্পতা, ডাইরিয়া, ম্যালেরিয়া, কৃমির সংক্রমনে ভুগে থাকে। ইপিআই প্রকল্পের মাধ্যমে দেশে শিশুমৃত্যুর হার কমলেও চা-শ্রমিকদের মাঝে প্রায়ই শিশুমৃত্যুর ঘটনা শোনা যায়।

চায়ের চারা রোপন হতে পাতাকুঁড়ি সংগ্রহ পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে নারী শ্রমিককেই সব কাজ প্রত্যক্ষভাবে করতে হয়। পুরুষের ভূমিকা এখানে পরোক্ষ বা পুরুষেরা কাজ করে সাহায্যকারী হিসেবে। অনেকেই অবাক হয়ে বলেন, রোগের আবার লিঙ্গভেদ কী! কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করে দেখিয়েছেন, কিছু নির্দিষ্ট রোগ নারীদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। নারী চা-শ্রমিকদের সাধারণ রোগগুলোর মধ্যে পানিস্বল্পতা, রক্তশূণ্যতা, গ্যাসট্রিক, গর্ভ, প্রসব, এবং প্রসবপরবর্তী রোগসমূহ লক্ষ্যণীয়।

অন্যদিকে পুরুষদের ক্ষেত্রে সাধারণত কলেরা, কুষ্ঠ, যক্ষা, ম্যালেরিয়া, টাইফযেড ইত্যাদি রোগ বেশি দেখা যায়। পুরুষ-নারীভেদে গণোরিয়া, সিফিলেসের মত কিছু যৌনবাহিত রোগও চা-শ্রমিকদের মাঝে বিদ্যমান; কিন্তু এ বিষয়ে কথা বলতে তথ্যদাতারা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না। খুব খারাপবোধ না করলে চিকিৎসকের সাথেও এ বিষয়ে চা-শ্রমিকেরা বলতে নারাজ। এছাড়া ঋতুভেদে জ্বর, ঠান্ডা-কাশি, চোখওঠা, পেটব্যথা, জন্ডিস, চর্মরোগ ইত্যাদি রোগ দেখা যায়।

যে রোগগুলি চা-শ্রমিকদের মাঝে খুব একটা দেখা যায় না সেগুলি হচ্ছে উচ্চ রক্তচাপ, বহুমূত্র(ডায়াবেটিস), হৃদরোগ, ক্যান্সার, কিডনি সমস্যা, মাথাব্যথা, বাতের ব্যথা, গলগন্ড ইত্যাদি। চিকিৎসা গ্রহণের ক্ষেত্রে এরা প্রথমত: ঝাড়ফুঁক, তন্ত্রমন্ত্রে বিশ্বাসী; দ্বিতীয়ত: বাগানের ডিসপেনসারিতে ফ্রি ঔষধ পাওয়া গেলে তা সংগ্রহ করে। আর্থিক দৈন্যতা এবং বাগানের বিধিনিষেধের কারনে বাইরের সরকারী হাসপাতালের চিকিৎসা এরা সচরাচর গ্রহণ করে না।

টি প্লান্টেশন লেবার অর্ডিন্যান্স (১৯৬২) এবং টি প্লান্টেশন লেবার রুলস (১৯৭৭) অনুযায়ী চা-শ্রমিকদের স্বাস্থ্য পরিচর্যার বিষয়টি পুরোপুরি বাগানমালিকের উপর ন্যাস্ত এবং প্রতিটা বাগানেই ডাক্তারখানা, ডিসপেনসারি, চিকিৎসক, নার্স, কম্পাউন্ডার, ড্রেসার, আয়া, স্টাফ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামসহ বাগানহাসপাতাল থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।

কোন কোন বাগানে ডিসপেনসারি নেই, আবার অনেক বাগানে ডিসপেনসারি থাকলেও পর্যাপ্ত ঔষধ নেই। আশঙ্কার ব্যাপার হল, এখানে সবরোগের চিকিৎসা চলে মাত্র ২/৩টি ঔষধে। ডিসপ্রিন, প্যারাসিটামল, এবং ডাইক্লোফেনজাতীয় ব্যথানাশক ছাড়া আর কোন ঔষধ ডিসপেনসারিতে থাকে না। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ধাত্রী বা নার্স না থাকায় চা বাগানগুলোতে মাতৃমৃত্যু ঘটছে অহরহ। অনেকক্ষেত্রে এমনও দেখা গেছে, বেতন বেশি দিতে হয় বলে কম্পাউন্ডার দিয়ে ডাক্তারের কাজ চালান হচ্ছে।

সুস্বাস্থ্য সংক্রামিত হয় না, কিন্তু রোগব্যাধি নানান মাধ্যমে ছড়ায়। তাই, আজ আপনি ভাল আছেন, কিন্তু আগামীকাল নাও থাকতে পারেন। আমি বলতে চাচ্ছি, আপনার শারীরিক সুস্থতা আপনার পাশের চা-শ্রমিকের সুস্থ্য থাকার সাথেও সম্পর্কিত।

স্বাস্থ্যসচেতনতামূলক কর্মশালা, পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা প্রশিক্ষণ, বিশুদ্ধ জলের সংস্থান, স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা ও পয়ঃনিস্কাশন, শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য পরিচর্যা ইত্যাদি ক্ষেত্রে সুযোগসুবিধা বাড়াতে পারলে বাংলাদেশের চা-শ্রমিকেরা বাগানে আরও অধিক শ্রম দিয়ে চা শিল্পকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারবে।

 

লেখক : শিক্ষক
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়


অন্যান্য খবর