সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০২৪

নৃবিজ্ঞান চর্চা : কিছু প্রস্তাবনা


গত শতকের মাঝামাঝি সময়ে নৃবিজ্ঞান চর্চার গুরুত্ব অনুধাবন করে এবং গবেষণার উর্বরভূমি হিসেবে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানকে চিহ্নিত করেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের সেই সময়ের অনেক বিদেশী সমাজবিজ্ঞানী ও নৃবিজ্ঞানীগণ, এঁদের মধ্যে পিয়েরে বেসাইনের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

সর্বজনশ্রদ্ধেয় অধ্যাপক নাজমুল করিম ষাটের দশকে পূর্ব পাকিস্তানে সমাজবিজ্ঞানের গবেষণা পদ্ধতি সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেন, Sociology, therefore must be social anthropology in the context of our country, at least for some years to পড়সব ’। পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশে গবেষণা পরিচালনা করতে গিয়ে বিশ্বখ্যাত নৃবিজ্ঞানী লেভী স্ট্রস (১৯০৯-২০০৯) উচ্ছ্বসিত হয়ে বলেছিলেন, ‘Bangladesh is a paradise of anthropological research’। এরপর পেরিয়েছে প্রায় সাড়ে তিন দশক, সব ধরণের সম্ভাব্যতা থাকার পরেও যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে বাংলাদেশে নৃবিজ্ঞান চর্চা এখনও চারা পর্যায়ে রয়ে গেছে বৃক্ষ হতে পারেনি। উপরন্তু বিভিন্ন সময়ে বিভ্রান্তিকর কথার করাতে এর ডালপালা ছেটে বিষয়টিকে বনসাই বানানর অপচেষ্টা চালিয়েছেন কেউ কেউ।

বি¯তৃত জ্ঞানকান্ডে নৃবিজ্ঞান একমাত্র বিষয় যা মানুষকে পূর্ণাঙ্গরূপে (অর্থাৎ জৈবিকতা ও সামাজিকতা নিয়ে) পাঠ করে, এ বিবেচনায় এটি জৈব-সামাজিক বিজ্ঞান। উপরন্তু স্থান এবং কালভেদে সকল মানুষের কৃষ্টি ও সংস্কৃতি চর্চা করে নৃবিজ্ঞান। উন্নত দেশগুলোতে নৃবিজ্ঞানের পঠন-পাঠন বহুমাত্রিকতা পেয়েছে, এবং নতুন নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি করে একে উৎসাহিত করা হচ্ছে। পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ভারতে নৃবিজ্ঞান চর্চা হচ্ছে শতাব্দীকাল ধরে, অথচ বাংলাদেশের মত ঐতিহ্যগত ও অদৃষ্টবাদী সমাজে বিষয়টির বয়স মাত্র আড়াই দশক। অবহেলিত হলেও আমাদের দেশে জন্মলগ্ন হতে বিষয়টি দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং স্বীকৃতিস্বরুপ ৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ও দুইটি কলেজে প্রায় আড়াই হাজার ছাত্র-ছাত্রী নৃবিজ্ঞানে অধ্যয়ররত।

এছাড়া বিগত বছরগুলোতে আরও প্রায় দুই হাজার ছাত্র-ছাত্রী স্নাতকোত্তর সনদ লাভ করেছে। উল্লেখ্য সকল বিশ্ববিদ্যালয় এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সব কলেজে সমাজবিজ্ঞানের পাঠ্যসূচিতে আংশিকভাবে নৃবিজ্ঞান পড়ান হচ্ছে। এ বিজ্ঞান পাঠের মাধ্যমে বিভিন্ন সামাজিক সমস্যার স্বরূপ ও প্রকৃতি উদঘাটন সম্ভব হয়। এছাড়া কোন একটা জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি এবং বিলুপ্তপ্রায় সমাজ সংগঠনের যথাযথ অধ্যয়ন নৃবিজ্ঞানের মাধ্যমেই সম্ভব। বলা নি¯প্রয়োজন, কোন বিষয় অধ্যয়নের শুরুতে এর সম্পর্কিত প্রাথমিক ধারণা দরকার; কলেজ পর্যায়ে নৃবিজ্ঞান না থাকাতে শিক্ষার্থীরা শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে বিষয়টির নাম শোনে এবং অনেকক্ষেত্রেই প্রকৃত ধারণা লাভে ব্যর্থ হয়।

বাংলাদেশে কর্মপরিধির প্রধাণ ক্ষেত্র হচ্ছে- ১. সরকার ও অধীনস্থ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, ২. বিদেশী দাতাগোষ্ঠী ও উন্নয়নসংস্থা, ৩. বেসরকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ। শেষোক্ত দু’টি পর্যায়ে নৃবিজ্ঞানের স্বল্প-সংখ্যক ছাত্র-ছাত্রীরা সুযোগ পেলেও কর্মসংস্থানের সবচেয়ে বৃহৎ ক্ষেত্র সরকারী প্রতিষ্ঠান গুলোতে তারা নিয়োগ পায়না।

প্্রসংগত উল্লেখ্য, বিভিন্ন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে সামাজিক বিজ্ঞানের বিষয়গুলোর (সমাজ বিজ্ঞান, লোক প্রশাসন, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ইত্যাদি ) উল্লেখ থাকলেও সেখানে নৃবিজ্ঞান অনুল্লেখের কারনে ছাত্র-ছাত্রীরা অযোগ্য বিবেচিত হচ্ছে । উপরন্তু প্রায়শই নৃবিজ্ঞানের ছাত্র-ছাত্রীরা কোন চাকুরীর লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় সন্তোষজনক ফলাফল করলেও নিয়োগ কর্তৃপক্ষের বিষয় সম্পর্কিত অজ্ঞতার কারনে নৃবিজ্ঞানের ছাত্র-ছাত্রীদেও নিয়োগদান করেন না।

এ যাবতকালে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উত্তীর্ন ছাত্র-ছাত্রীদের অনেকেরই শিক্ষকতার যোগ্যতা ও ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সীমিত সংখ্যক পদেও কারনে তা সম্ভব হচ্ছেনা, এবং কলেজ পর্যায়ে নৃবিজ্ঞান বিভাগ না থাকায় দিনে দিনে সমস্যা আরও প্রকটরুপ লাভ করছে ।
সৃষ্ট সমস্যার সংকট নিরসনে আমাদের দাবিঃ
০১. সামাজিক বিজ্ঞানের অন্য সব বিষয়ের সাথে সরকারী চাকুরীর ক্ষেত্রে বিভিন্ন স্তরে নৃবিজ্ঞানের গ্রাজুয়েটদের আবেদন করার সুয়োগ দিতে হবে।
০২. সকল নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে শিক্ষাগত যোগ্যতার ক্ষেত্রে নৃবিজ্ঞান বিষয়ের উল্লেখ থাকতে হবে।
০৩. সমাজ গবেষণা ও উন্নয়নমূলক প্রতিষ্ঠানসমূহে নৃবিজ্ঞানের গ্রাজুয়েটদের অগ্রাধিকার দিতে হবে।
০৪. উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার পাঠ্যসূচিতে স্বতন্ত্র বিষয় হিসেবে নৃবিজ্ঞানের উল্লেখ থাকতে হবে; এজন্য পৃথক বিভাগ প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
০৫. পর্যায়ক্রমে সকল সরকারী-বেসরকারী, কারিগরী, প্রকৌশল, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, কৃষি ও চিকিৎসা বিশ্ববিদ্যালয়ে আলাদা বিভাগ এবং সমন্বিত কোর্সের অংশ হিসেবে নৃবিজ্ঞানকে সম্পৃক্ত করতে হবে।
০৬. পূর্ব প্রতিষ্ঠিত নৃবিজ্ঞান বিভাগসমূহের শূন্য পদে জরুরী ভিত্তিতে শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে।
০৭. বিসিএস পরীক্ষায় বিশেষ বিষয় হিসেবে নৃবিজ্ঞানকে বিবেচনা করতে হবে।
যাহোক, আমাদের সামাজিক সম্প্রীতির ঐতিহ্য ধরে রাখতে, নিজেদেরকে অনুপুঙ্খরুপে জানতে-চিনতে, সর্বোপরি সময়ের প্রয়োজনেই এখন নৃবিজ্ঞান চর্চার ব্যাপকায়ন করতে হবে।

 

সুমন আখন্দ
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়


অন্যান্য খবর