বুধবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৪

নৃবিজ্ঞান পড়লেই কেউ নাস্তিক হয়ে যায় না


অন্যান্য সামাজিক বিজ্ঞানের সাথে তুলনা করলে দেখা যাবে বাংলাদেশে নৃবিজ্ঞান চর্চার ইতিহাস খুব বেশি দিনের নয়। বিগত শতকের সত্তুরের প্রথম ভাগে অধ্যাপক আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী এবং আমেরিকান নৃবিজ্ঞানী পিটার জে বার্টোসি নৃবৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বন করে যথাক্রমে মুন্সিগঞ্জ ও কুমিল্লায় তাঁদের গবেষণাকার্য পরিচালনা করেন। পরবর্তী সময়ে আরও অনেকে গবেষণাকর্ম, অভিসন্দর্ভ, বক্তব্য-ভাষণ, প্রতিবেদন লিখন প্রভৃতির মাধ্যমে বিষয়টি পরিচিতকরণে অবদান রাখেন।

১৯৮৫ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১৯৯২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আলাদা বিভাগ খোলার মাধ্যমে বাংলাদেশে নৃবিজ্ঞান চর্চার ভিত্তিভূমি রচিত হয়, এবং এটি হয় মূলত সমাজবিজ্ঞানীদের মাধ্যমে, বর্তমানে অবশ্য অবস্থাটা বদলেছে- এখন সবাই নৃবিজ্ঞান পড়েই নৃবিজ্ঞানী হচ্ছে। সমাজের বাস্তবতা অনুধাবনে পদ্ধতিগত উৎকর্ষতার কারণে ইতোমধ্যে বিষয়টি সম্পর্কে অনেকের আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে; পাশাপাশি একটি বিশিষ্ট জ্ঞানকান্ড হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক সুনাম অর্জন করতে সমর্থ হয়েছে। এটা ভাল দিক, কিন্তু বিপরীতক্রমে কয়েকটি ভ্রান্তবিশ্বাস বা ভুলবুঝাবুঝি সৃষ্টি করেছে যার কোন বিষয়গত ভিত্তি নেই।

উদাহরণম্বরূপ, উল্লেখ করা যায় বিভিন্ন দাতাগোষ্ঠী ও বেসরকারী সংস্খার গবেষকদের কথা; এরা ধারণা পোষণ করেন, যে কেউ নৃবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মাঠকর্ম করে একটা গ্রন্থ প্রকাশ করলেই নৃবিজ্ঞানী হওয়া যায়। আসলে ব্যাপারটা এরকম নয়, নৃবিজ্ঞানী হতে হলে অবশ্যই একজনকে এ বিষয়ের উদ্ভব, বিকাশ, পরিধি, বিষয়বস্তু, শাখা-প্রশাখা, তাত্ত্বিক প্রেক্ষাপট, গবেষণা পদ্ধতি প্রভৃতি বিষয়ে সম্যক ধারণা রাখতে হবে; সর্বোপরি বিভিন্ন জাতিবিবরণ (ঊঃযহড়মৎধঢ়যু) ও জাতিতাত্ত্বিক (ঊঃযহড়ষড়মরপধষ) তথ্য সম্পর্কে সম্যক অবগত হতে হবে- যা কোন ভাবেই দীর্ঘ প্রাতিষ্ঠানিক অনুশীলন, চর্চা, ও প্রশিক্ষণ ছাড়া সম্ভব নয়।

নৃবিজ্ঞানের শিক্ষক হওয়াতে অনেক সময় শিক্ষার্থী-শুভার্থী, গবেষক-সাংবাদিক, আত্মীয়-নিকটীয়, বন্ধু-বান্ধবের নানাবিধ জিজ্ঞাসা ও বিব্রতকর মন্তব্যের মুখোমুখি হতে হয়। এ লেখায় কিছু প্রচলিত অবিদ্যাকে সংশোধনের প্রয়াস থাকবে।

প্রথমত : ইংরেজী ভাষায় উচ্চারণগত সামান্য সাদৃশ্যের (এ্যানটোমলোজি এবং এ্যানথ্রপলোজি) কারণে শিক্ষিতদের অনেকেই নৃবিজ্ঞানকে পোকামাকড়ের পঠনপাঠন বা কীটতত্ত্বের একটি শাখা ভেবে ভুল করেন। বস্তুতঃ দুটো বিষয়ের রয়েছে বৈশিষ্ট্যসূচক ভিন্নতা বিষয়বস্তুগত স্বতন্ত্রতা। আবার অনেক সময় দেখা যায় যারা স্বল্পপড়ুয়া তারা ‘এ্যানথোলজি’ (যার বাংলা অর্থ সংকলন) এবং ‘এ্যানথ্রপলোজি’র মধ্যে পার্থক্য করতে ব্যর্থ হন।

একইভাবে বাংলায় ‘নৃবিজ্ঞান’ এবং ‘মৃত্তিকাবিজ্ঞান’ এ বিষয়দুটোর উচ্চারণগত সামান্য সাদৃশ্যের কারণে প্রায়ই গুলিয়ে ফেলেন অনেকে। এসবের বাইরে আরেকটি ভুল ধারণা হলো, নৃবিজ্ঞানকে প্রতœতত্ত্বের (অৎপযধবড়ষড়মু) সাথে গুলিয়ে ফেলা। এ ধারণায় ভাবা হয়, নৃবিজ্ঞান মানে হলো প্রাচীণ মানুষের হাড়গোর, কংকাল, মাথার খুলি, ব্যবহৃত হাতিয়ার ইত্যাদির অধ্যয়ন। আসলে তা নয়, এসবই প্রতœতত্ত্বের পাঠ্য। তবে মানুষের ইতিহাস পাঠের জন্য, অতীতের সমাজ-সভ্যতার চর্চা নৃবিজ্ঞানে হয়ে থাকে। এজন্য নৃবিজ্ঞানের একটি পূর্ণাঙ্গ শাখা রয়েছে। আবার কেউ কেউ এটিকে সমাজতত্ত্বের শাখা প্রমাণে গলদঘর্ম হন, এটিও একটি অবিদ্যা। নৃবিজ্ঞান কখনোই সমাজতত্ত্বের শাখা হতে পারে না, বরং উল্টোটিই যুক্তিযুক্ত তা বোধ করি অভিজ্ঞ সমাজবিজ্ঞানী মাত্রই স্বীকার করবেন।

সমাজবিজ্ঞান শুধুই সামাজিক বিজ্ঞান আর নৃবিজ্ঞান হল তার চেয়ে বেশি কিছু। কেউ কেউ বলেছেন মানুষকে পূর্ণাঙ্গরূপে পাঠ করার জন্যই এটা জৈব-সামাজিক বিজ্ঞান। এজন্য নৃবিজ্ঞানের পরিধি বি¯তৃত ও ব্যাপক; জাতিবিবরণ, জাতিতত্ত্ব, প্রতœতত্ত্ব, এবং ভাষাতত্ত্ব ছাড়াও দৈহিক নৃবিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা এর অধ্যয়নভুক্ত। সমাজ ও সংস্কৃতির অনুপুংখ পাঠের জন্য অনেক দেশেই সমাজবিজ্ঞানের সাথে সামাজিক নৃবিজ্ঞান চর্চার নজির রয়েছে, আমাদের দেশেও দীর্ঘ সময় ধরে সমাজবিজ্ঞানের সাথে একটি কোর্স হিসেবে পঠনপাঠনের পর আশির দশকের শেষভাগে বিশ্ববিদ্যালয়ে আলাদা বিভাগ খোলার মধ্য দিয়ে বিষয়টির প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা শুরু হয়।

দ্বিতীয়ত : অনেকেই মনে করেন আদিবাসী বা উপজাতী সংস্কৃতি সম্বন্ধে অধ্যয়নই হল নৃবিজ্ঞান। প্রকৃতপক্ষে আদিম-আধুনিক, অনুন্নত-উন্নত, অপাশ্চাত্য-পাশ্চাত্য, ক্ষুদ্র-বৃহৎ সব ধরণের সংস্কৃতি নৃবিজ্ঞানের আলোচনার অন্তর্গত। মানুষের সামগ্রিক পাঠের জন্য নৃবিজ্ঞানের প্রধান পাঁচটি শাখা রয়েছে। এগুলো হচ্ছে- ক) সামাজিক বা সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞান খ) দৈহিক বা শারীরিক নৃবিজ্ঞান গ) ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞান ঘ) নৃবৈজ্ঞানিক প্রতœতত্ত্ব এবং ঙ) প্রায়োগিক নৃবিজ্ঞান। বিভিন্ন সমাজে গবেষণা এবং বিষয়বৈচিত্র্যের প্রাচুর্যতার কারণে বর্তমানে এর এত অধিক সংখ্যক শাখা-প্রশাখার উদ্ভব ঘটেছে এবং এত গবেষণাকর্ম হয়েছে যে একজন নৃবিজ্ঞানীর পক্ষে একাধিক শাখার বিশেষজ্ঞ হওয়া সম্ভব নয়।

তৃতীয়ত : সাম্প্রতিককালে কারো কারো মন্তব্য শুনেছি, নৃবিজ্ঞান মনে করে মানুষের উৎপত্তি হয়েছে বানরের বংশ হতে। আরও মুখরোচক উপস্থাপনায় কেউ কেউ বলে ফেলে বিষয়টি শিক্ষার্থীদের নাস্তিক বানিয়ে ফেলে। সচেতন শ্রোতামাত্রই বুঝতে পারবেন- বক্তব্যগুলো নিছক অল্পবিদ্যার আস্ফালন। আসলে মানুষ ও তার সংস্কৃতির পূর্ণাঙ্গ পাঠ করতে গিয়ে নৃবিজ্ঞান এগুলোর উদ্ভব এবং বিকাশ সম্পর্কিত বিভিন্ন তত্ত্ব ও মতবাদ (যথাঃ ডারউইনবাদ, ল্যামার্কবাদ, মেন্ডেলবাদ, মার্ক্সবাদ ইত্যাদি) পর্যালোচনা করে; এক্ষেত্রে উল্লেখ্য যে সবক’টি মতবাদেরই তাৎপর্যপূর্ণ সমালোচনা রয়েছে এবং সর্বজনস্বীকৃত কোন তত্ত্ব এখন পর্যন্ত নৃবিজ্ঞানে প্রতিষ্ঠা পায় নি। আর তাছাড়া আস্তিক্য নাস্তিক্যের প্রসঙ্গটিও অনেক আগে আপেক্ষিক হয়ে গেছে। কারো কাছে আল্লায় বিশ্বাস, কারো কাছে দেবতায় বিশ্বাস, কারো কাছে প্রাকৃতিক বস্তুতে বিশ্বাস হলো আস্তিক্যবাদ। আবার স্বামী বিবেকানন্দ বলেছেন মানুষের নিজের ক্ষমতায় বিশ্বাস স্থাপনই হচ্ছে আস্তিকতা; বিশ্বাস হারানোটা বরং নাস্তিকতা। এরপরও কী নৃবিজ্ঞানকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যায়?

চতুর্থত : কোন কোন অভিভাবক ধারণা করেন মেয়েদেরকে নৃবিজ্ঞান পড়ান ঠিক না; কেননা ওদের চোখ খুলে যায়, বেপর্দা চলাফেরা করে, মুখে মুখে তর্ক করে, সমাজ-নমাজ মানে না ইত্যাদি ইত্যাদি। একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে বুঝা যায় অন্য যে কোন বিষয়ে পড়ুয়া মেয়েরাও উপরোক্ত আচরণ করতে পারে, এর জন্য কোন বিশেষ বিষয় পড়ার প্রয়োজন পড়ে না। নৃবিজ্ঞান না পড়েও বেগম রোকেয়া, ইলা মিত্র, মনিকুন্তলা সেন, গীতা মুখার্জী, প্রীতিলতা, হেনা দাস, সুফিয়া কামাল প্রমুখেরা যার যার অবস্থানে থেকে প্রতিবাদ করেছিলেন। এখনও যারা আছেন তসলিমা নাসরিন থেকে শুরু করে সেলিনা হোসেন বা আয়েশা খানম, মালেকা বেগম এদের কেউই নৃবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী ছিলেন না। সমাজে নারীর প্রতি বঞ্চনা, গঞ্জনা দেখে যারা চোখ খোলার, তর্ক করার তারা ইসলামের ইতিহাস বা উর্দু-পার্সী বিষয়ে পড়লেও চোখ খুলবে এবং তর্ক করবে। এজন্য নৃবিজ্ঞানকে দোষারোপ করা আর অতিবৃষ্টির জন্য সমুদ্রকে দায়ী করা একই কথা। মানবসমাজের অত্যাবশ্যকীয় অনুষঙ্গ হিসেবেই নারীবাদের উদ্ভব ও বিকাশ, উন্নয়নে নারীর অংশগ্রহণ, নারী অধস্থনতা, নারীর ক্ষমতায়ন ইত্যাদি বিষয় এখানে আলোচিত হয়।

বস্তুত ঃ মানব সম্পর্কীত এমন কোন বিষয় নেই যা নৃবিজ্ঞানের পাঠ্যক্রমে নেই; কারণ নৃবিজ্ঞান হল ‘সময় ও স্থানভেদে মানুষের পূর্ণাঙ্গ পাঠ’। নৃবিজ্ঞানের ছাত্র-ছাত্রীরা শেখে এ্যারিষ্টটলের দর্শন তত্ত্ব, কার্ল মার্ক্সের সমাজচিন্তা, ডারউইনের বিবর্তনবাদ, পল সার্ত্রের অস্তিত্ববাদ, সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মনোসমীক্ষণ, মিশেল ফুঁকোর ক্ষমতাতত্ত্ব ইত্যাদি; এবং আত্মস্থ করে মহাত্মা গান্ধীর অহিংস নীতি, মহাকবি গ্যেটের বিশ্ববীক্ষা, সিদ্ধার্থের জীবপ্রীতি, বড়ু চন্ডীদাসের মানবপ্রীতি, ক্ষুদিরামের স্বদেশপ্রেম। গুরুত্বের দিক থেকে বিবেচনা করলে প্রশাসক, ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ, আইনজীবি, চিকিৎসক যারা সরাসরি জনসাধারণের সাথে কাজ করেন তাদের সবাইকে সাধারণ মানুষকে বুঝার স্বার্থেই নৃবিজ্ঞান পাঠ করতে হবে; এছাড়া বিষয়টি লেখক, শিল্পী, নীতিনির্ধারক যারা দেশকে ও দেশের মানুষকে জানতে চান, তুলনামূলক চর্চার মাধ্যমে উন্নয়ন ঘটাতে চান তাদের জন্যও অবশ্যপাঠ্য হওয়া উচিত। ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় হতে অধ্যয়ন সম্পন্ন করে অনেক শিক্ষার্থী দেশ-বিদেশে বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত রয়েছে। এখন সময় এসেছে জাতীয় পর্যায়ে নৃবিজ্ঞানের সমন্বিত বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নৃবিজ্ঞানের সমকালীন বিকাশের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে বিষয়টির উৎকর্ষতা সাধন এবং পরিধি বিস্তার। বিশেষ করে দেশের সরকারী ও বেসরকারী কলেজগুলোতে যদি নৃবিজ্ঞানের প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করা যায় তাহলে সেদিন বেশি দূরে নয় যেদিন ব্যাপক চর্চার ফলে এমন একজনকেও পাওয়া যাবে না, নৃবিজ্ঞান সম্পর্কে যিনি কিছুই জানেন না বা ভয়ানক বিভ্রান্তে আক্রান্ত।

 

সুমন আখন্দ
শাহজালালা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়


অন্যান্য খবর