সোমবার, ২২ এপ্রিল ২০২৪

প্রিয় মা


তুমিই তো প্রথম শিখিয়েছিলে, ‘একা হলে হারি, এক হলে পারি’। শুধু এই চাওয়াটিকেই যদি সারাজীবনের চাওয়া ধরে নেই তবুও কী এক হয়ে থাকা যায়? নিয়ে যাবার উছিলা যখন গোঁয়ারের মত দূয়ারে এসে দাড়ায়, তখন কাউকে না কাউকে চলে যেতে হয়।

বাবা চিরতরে চলে যাবার আগে তোমার ছোট মেয়ে দুটো একে একে পরের বাড়ি চলে গেল। একটু ভাল করে বাঁচব বলে আমিও চলে এলাম তোমার কোল ছেড়ে। এরপর হতে দেখেছি, তুমি কেমন একা একা, বোকা বোকা! যা কিছু কর তাতেই তোমার ভুল হয়ে যায়। পুত্রের কাছে ভুল, পুত্রবধূর কাছে ভুল, মেজ ও ছোট জামাইয়ের কাছে ভুল, মেয়েদের কাছে ভুল।

মনে হয় জগতের সবচেয়ে সহজ কাজ এখন তোমার ভুল ধরা। একটি হতে অন্য ভুলে যেতে যেতে তুমি হয়তো ভাব শৈশব-কৈশোর-যৌবনের মধূর ভুলগুলোর কথা।

বাবা চলে গেল বেশ কয়বছর হয়ে গেল, কিন্তু তার ছায়া গেল না! আমি এখন যা-ই করি বাবার মত করি অথবা হয়ে যায়, কখনও ইচ্ছায় অথবা অনিচ্ছায়। তুমি তো প্রায়ই বলো তাকে স্বপ্নে দেখো, আমি কিন্তু রাতের ঘুমে একবারের জন্যও তাকে দেখিনি। এটা এক আশ্চর্য বিষয়! পরে অবশ্য ভেবেছি তিনি সারাদিন আমার সাথে থাকেন বলে আর রাতের স্বপ্নে আসেন না।

হয়তো এসময়ে তোমাদের কাছে চলে যান! বাবা যখন ছিল, তোমাদের শত অছিহতেও আমি এক ওয়াক্ত নামাজ পড়িনি, কিন্তু বাবা যাবার পড়ে এক ওয়াক্তও ছাড়িনি। নিজে বেহেস্তে যাবার জন্য নয়, তার জন্য প্রার্থণার আর কোন মোক্ষম উপায় আমি পাইনি!

মনে পড়ে, গ্রীস্মের আম, জাম, কাঁঠাল উজার হবার পর আমরা পাঁচটি একপ্রাণ বরষার ভরসায় থেকেছি; বৃষ্টি থামলেও শুভ্র মেঘে আমাদের স্বপ্ন ওঠা থামত না। মেঘে মেঘে শরৎ শেষ হলে আমরা তোমার মুখেই হেমন্তের কথা শুনেছি; নবান্ন নেমন্তন্ন ফুরিয়ে গেলে তুমি শীতের গীতে আস্থা রাখতে।

কুয়াশার সহশিল্পী শিশিরের শব্দ থেমে গেলে বাকি থাকত বসন্ত-বন্দনা; তুমি বলতে, ‘কাউকে ভালোবাসা দিলে বসন্তে দিও!’ কিন্তু আমাদের আশার শেষ ফুলটিও যখন ঝরে যেত অবহেলায়- তুমি একটু হেসে আবার শুরু করতে গ্রীস্মের দিন গোনা।

তোমার উৎসাহেই স্বপ্নের পর স্বপ্নের ঢেউ, আমাদের একপ্রাণের পিছু ছাড়েনি! এরপর সময়ের প্রয়োজনে পালাক্রমে দুইপ্রাণ, তিনপ্রাণ, চারপ্রাণ হয়েছি ঠিকই, কিন্তু আমি জানি, আমার বোনেরাও জানে, নাড়ির টানে আমরা এখনও এক। আমরা খন্ড খন্ড হলেও তুমি আমাদের মাঝে অখন্ড হয়ে আছ।

মা! তুমি এখন যা, আমি একদিন তাই হব। ষাট-সত্তুরের মরণপুরে একদিন আমার লক্করঝক্কর গাড়িও পৌছাবে। কিন্তু তার আগে আমার সন্তানের কানে কানে শিখিয়ে যাব তোমার বীজমন্ত্র, ‘এক হয়ে লড়ি, একা হলে মরি!’
ভাল থেকো মা!

ইতি

গুণমুগ্ধ ছেলে
সুমন আখন্দ

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়


অন্যান্য খবর