বুধবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৪

সিলেটের আদিবাসী পাত্রদের পাত্র-পাত্রী


তখন ছিল বসন্ত, তখন ফাগুন মাস। সিলেটের আদিবাসী পাত্রদের বিয়ের মওসুম। আমি গেলাম এ সম্প্রদায়ের সাথে পরিচিত হতে, এবং নিজেকে পরিচিত করাতে। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করলেও এখানে আমি অভ্যাগত। এরা ছড়িয়ে আছে শহর হতে দশ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে খাদিমনগর টিলার আশেপাশের গ্রামে।

নিজেদেরকে ‘লালং’ জাতি বলে পরিচয় দেয় এরা, কথা বলে লালং ভাষায় । ‘লালং’ -এর বাংলা অর্থ পাথর। ঐ. জরংষবু -এর ঈধংঃব ধহফ ঞৎরনবং (১৮৭২) গ্রন্থেও এর সত্যতা মিলেছে, আলোচনায় পাত্রদের উল্লেখ করা হয়েছে ‘পাথর’ বা ‘পাতর’ (Pathor, Pator) হিসেবে। যদিও খটোমটো তারপরও ভাব জমাবার জন্য ওদের ভাষার কয়েকটি লাইন শিখেছিলাম শুরুতেই।
-নাং রামেন দি (আপনার নাম কি)?
-সুকেন্দ্র পাত্র।
-নাং মাই দাহাং (আপনি ভাল আছেন কি)?
-দাহাং (হ্যা, ভাল)।

সুকেন্দ্রর আজ বিশেষ দিন, কুঞ্জমঞ্চে ওকে দেখতে বিশেষরকম লাগছিল। আজ ওর ঘরে আসবে রূপসী দেবী, এই দিনটির জন্য কতদিনের প্রতীক্ষা ও আয়োজন। ৪/৫ বছর আগে বাবা মহেন্দ্রনাথ পাশের গ্রামে কুলেন্দ্রনাথের কন্যাকে পছন্দ করেন। গত অগ্রহায়ণে পান-সুপারী দিয়ে বিয়ের কথা ফাইনাল করে আসেন মহেন্দ্রনাথ।

এরপর পৌষ মাসে উপহারসামগ্রী ও পান-সুপারী বিনিময়ের মাধ্যমে উভয়পক্ষের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা দিনতারিখ ঠিক করেন। পাত্রদের মধ্যে দুই ধরণের বিয়ে চালু আছে- ‘সীতাক্ষী’ ও ‘তাইতাক্ষী’। সীতাক্ষী হল বলপ্রয়োগে বিবাহ, যা ‘ছাইভস্ম’ বিয়ে হিসেবেও পরিচিত- বেশিরভাগ পাত্র এটাকে ঘৃণার চোখে দেখে এবং পারতেসাধ্যে পবিহার করার চেষ্টা করে।

সমাজসম্মত এবং সবার কাছে কাংখিত বিয়ে হচ্ছে তাইতাক্ষী। সুকেন্দ্রর বিয়ের এক সপ্তাহ আগে থেকেই ‘থিবাম’ (পূর্বপুরুষ পূজা), ‘খেয়াই লারাম’ (রূপসীদেবী পূজা) ও অন্যান্য সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান শুরু হয়। বাঙালী সমাজের মতই বিয়ের আগের দিন গায়ে হলুদ। গোছলের আগে আমি সুপুরুষ সুকেন্দ্রর সাথে মজা করলাম।
-হলুদ তো মাখা আছেই এবার একটু মরিচ আর লবন মেখে গরম তেলে ছেড়ে দি, কি বলো!
-সেটার জন্য তো সারাজীবনই পড়ে আছে মাস্টরসাব।

ওর এমন তাৎক্ষণিক জবাবে থ মেরে গেলাম। আলাপ-আলোচনায় জানলাম অনেককিছু। ঠগ, প্রতারনা ও জোচ্চুরীর বিভিন্ন কারণে জমি খোয়ানোর আগ পর্যন্ত পাত্রদের বিবাহ অনুষ্ঠানে জৌলুস ছিল, আর্থিক অবনতির কারনে এখন সেগুলো হারিয়ে দাড়িয়েছে কেবল আনুষ্ঠানিকতায়। সর্বপ্রাণবাদী (animist) সম্প্রদায় হলেও আদিবাসী পাত্রদের বর্তমান বিবাহ রীতিনীতি পুরোপুরিভাবে হিন্দুবাদ দ্বারা প্রভাবিত।

আরেকটা বিষয় লক্ষণীয়, পাত্রসমাজে তালাক বা বিবাহবিচ্ছেদের প্রচলন নেই। ‘এক বিয়ে এক জীবন’ -এটাই সকলের ব্রত। তবে পাত্রসমাজে বিধবাবিবাহের ব্যাপারে কোন নিষেধাজ্ঞা নেই, কেউ বিধবা বিয়েতে আবদ্ধ হলে প্রচলিত নিয়মেই তাকে সামাজিক স্বীকৃতি দেয়া হয়। পাত্ররা নিকটাত্মীয় বিবাহকে (যেমনঃ মামাতো-খালাতো, চাচাতো-ফুপাতো ভাই বোন) অপছন্দ করে, এবং অনেকক্ষেত্রে অযাচার মনে করে। ব্যতিক্রম অবশ্য রয়েছে; ‘সীতাক্ষী’ বা ‘ছাইভস্ম’ বিয়ের বেলায় এ নিয়ম মেনে চলা সম্ভব হয় না।

বাংলাদেশের অন্যান্য সম্প্রদায়ের মতো পাত্ররা নিজেদের মধ্যে বিয়েকে সীমাবদ্ধ রাখতে চায়। এরা প্রতিবেশী চা-শ্রমিক খাসিয়া মুণ্ডা কুকি বা মূলধারার বাঙালীদের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করে না। অতীতে যারা এ নিয়ম ভেঙেছে তাদেরকে চিরতরে গ্রাম ছাড়তে হয়েছে।
যাহোক, অন্যান্য পরিজনের সাথে আমি সুকেন্দ্রর চৌদোলা যাত্রায় সঙ্গী হলাম, ‘পুনঃস্নান’ (কনের বাড়িতে আসার পরে গোছল) দেখলাম, ‘সাতপাক’ (বরকে কনের সাতবার প্রদক্ষিণ) দেখলাম, ‘জলদাড়িয়া’ (কনের পায়ের ওপর বরের পা রাখা অবস্থায় জল ঢালা) উপভোগ করলাম।

অনুষ্ঠানে আসা সবার ঐক্য ও সংহতিতে মুগ্ধ হয়ে বাঁশের উপর বসে অমৃত খেলাম, প্রবীণদের সাথে বসে একটু ‘হাণ্ডি’ (পাত্রদের নিজস্ব পানীয়) পান করলাম। খাদিমনগর থেকে ফেরার সময় মনে হয়েছে, আরো যদি কিছুদিন থাকা যেত- এমনি করে, এখানে, এভাবেই…

 

সুমন আখন্দ
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়


অন্যান্য খবর